ভোটের ফল নির্ধারণে তিন নিয়ামক—তবে ব্যবধানই আসল প্রশ্ন

১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুদিন পর একটি প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন। ২০০৮ সালের পর প্রথমবারের মতো এই নির্বাচনকে ঘিরে রয়েছে অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনা। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম ব্যালটে থাকছে না আওয়ামী লীগ—যা পুরো নির্বাচনী সমীকরণকেই নতুন মাত্রা দিয়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি শুধু সরকার পরিবর্তন করেনি; বদলে দিয়েছে দেশের রাজনৈতিক মানচিত্র। সেই প্রেক্ষাপটে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়ে উঠেছে এক নতুন বাস্তবতার পরীক্ষা।

বিভিন্ন জাতীয় জরিপ—যার মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সমীক্ষা—বিশ্লেষণ করে পাওয়া ইঙ্গিত হলো: ৩০০ আসনের সংসদে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে। তবে ভোটের ব্যবধান ও চূড়ান্ত ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেক বেশি।


জরিপের ফল: ব্যবধান আছে, তবে একরকম নয়

হাসিনা সরকারের পতনের পর পরিচালিত প্রতিটি জরিপেই বিএনপিকে জামায়াতে ইসলামীর চেয়ে এগিয়ে দেখা গেছে। কিন্তু এই ব্যবধান একেক জরিপে একেক রকম—কোথাও পার্থক্য সামান্য, কোথাও তা ২০ শতাংশের বেশি।

এই ভিন্নতা এলোমেলো নয়; বরং পদ্ধতিগত পার্থক্যের ফল। কিছু জরিপ নির্দিষ্ট সময়ের ‘স্ন্যাপশট’ তুলে ধরেছে, আবার কিছু প্যানেল স্টাডি সময়ের সঙ্গে জনমতের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করেছে। ফলে চিত্র একরৈখিক নয়—বরং পরিবর্তনশীল।


আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক: কার দিকে যাবে?

এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় অজানা সমীকরণ হলো আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যগত ভোট। অতীতে দলটি নিয়মিতভাবে ৩৫–৪৮ শতাংশ ভোট পেয়ে এসেছে। বর্তমানে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় প্রায় ৪ কোটি ভোটার নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন।

জরিপ অনুযায়ী, এই ভোটারের বড় অংশ বিএনপির দিকে ঝুঁকছেন। তবে জামায়াতও এই ভোটের উল্লেখযোগ্য অংশ পাচ্ছে। আওয়ামী লীগের সাবেক ভোটারদের একাংশ ইসলামপন্থী শক্তির দিকে ঝুঁকছেন—যা নির্বাচনের ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে পারে।


ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট: ছোট ভোট, বড় আসন

বাংলাদেশে প্রচলিত ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ (FPTP) পদ্ধতিতে যে প্রার্থী সর্বাধিক ভোট পান, তিনিই জয়ী হন—ভোটের ব্যবধান যাই হোক না কেন।

এই ব্যবস্থায়:

  • জাতীয় ভোটের সামান্য লিডও আসনে বড় ব্যবধানে রূপ নিতে পারে
  • সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা সমর্থন বেশি কার্যকর
  • নির্দিষ্ট অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত ভোট তুলনামূলক কম সুবিধা দেয়

ফলে যদি জাতীয়ভাবে বিএনপি মাত্র ৩–৫ শতাংশ এগিয়েও থাকে, তবে আসনে ব্যবধান ৬০–১০০ পর্যন্ত হতে পারে।


ফল নির্ধারণে তিনটি মূল সমীকরণ

১. বিদ্রোহী প্রার্থী

বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে। মনোনয়ন না পেয়ে ৯২ জন নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। অন্তত ৪৬টি আসনে তাঁদের নিজস্ব ভোটভিত্তি রয়েছে।

যেখানে লড়াই সরাসরি বিএনপি বনাম জামায়াত—সেখানে বিএনপি এগিয়ে।
কিন্তু ত্রিমুখী লড়াইয়ে মাত্র ৩৫% ভোট পেলেই জয় সম্ভব—যা জামায়াতকে সুবিধা দিতে পারে।
মডেল অনুযায়ী, বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে বিএনপি ১৫–৩০ আসন হারাতে পারে।


২. তরুণ ভোটারের উপস্থিতি

মোট ভোটারের প্রায় ৪৪ শতাংশ তরুণ প্রজন্ম। প্রথমবার ভোট দেবেন—এমন ভোটারদের বড় অংশ ইসলামপন্থী শক্তির দিকে ঝুঁকছেন বলে জরিপে দেখা গেছে।

যদি তরুণদের ভোটদানের হার জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি হয়, জামায়াতের আসন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
অন্যদিকে, তরুণ ভোটাররা যদি কেন্দ্রে না যান, তবে তাদের সম্ভাব্য আসন বড় ব্যবধানে কমে যেতে পারে।


৩. দোদুল্যমান ভোটার

১৫–৩৫ শতাংশ ভোটার এখনো সিদ্ধান্তহীন। কিছু জরিপে এই হার ১৭ শতাংশ।

এই ভোটাররা যদি সমানভাবে বিভক্ত হন, বিএনপির লিড থাকবে।
কিন্তু যদি ২:১ অনুপাতে জামায়াতের দিকে ঝুঁকে পড়েন, তবে নির্বাচনী ফল নাটকীয়ভাবে বদলে যেতে পারে।


সম্ভাব্য আসন পূর্বাভাস

সংসদের মোট আসন: ৩০০
সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন: ১৫১

সম্ভাব্য চিত্র (গড় প্রাক্কলন অনুযায়ী):

  • বিএনপি ও জোট: ১৫৫–২১৫
  • জামায়াত ও এনসিপি: ৫৫–১১০
  • জাতীয় পার্টি: ৫–১৮
  • ইসলামী আন্দোলন: ২–১০
  • অন্যান্য/স্বতন্ত্র: ১০–৩৫

কেন্দ্রীয় প্রাক্কলন অনুযায়ী:

  • বিএনপি: প্রায় ১৮৫ আসন
  • জামায়াত: প্রায় ৮০ আসন

চারটি সম্ভাব্য রাজনৈতিক দৃশ্যপট

১️ বিএনপির নিরঙ্কুশ জয় (৫০%)
১৮৫–২১৫ আসন। উচ্চ ভোটার উপস্থিতি ও আবেগী ভোট প্রভাব ফেলবে।

২️ সামান্য ব্যবধানে বিএনপি জয় (২০%)
১৫৫–১৮৫ আসন। বিদ্রোহী প্রার্থী বড় ভূমিকা রাখবে।

৩️ ঝুলন্ত সংসদ (২০%)
কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। জোট রাজনীতি শুরু হবে।

৪️ জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের জয় (১০%)
তরুণ ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি ও বিএনপির ভোটভাগের ফলে নাটকীয় ফল।


শেষ কথা

প্রধান পূর্বাভাস বলছে—বিএনপি প্রায় ১৮৫ আসন নিয়ে সরকার গঠনের সম্ভাবনায় এগিয়ে। জামায়াত তাদের ইতিহাসের সেরা ফল করতে পারে এবং প্রধান বিরোধী শক্তি হয়ে উঠতে পারে।

তবে এই নির্বাচনের আসল প্রশ্ন কে জিতবে তা নয়—বরং জয়ের ব্যবধান কতটা হবে। ২১০ আসনের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আর ১৫৫ আসনের নড়বড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার মধ্যে পার্থক্যই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।

১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের রায় শুধু সরকার বদলাবে না; দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারে।

তথ্য বলছে—পাল্লা বিএনপির দিকে।
কিন্তু একই সঙ্গে তথ্য এটাও বলছে—অপ্রত্যাশিতের জন্য প্রস্তুত থাকুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *