অ্যানিম্যাল ফার্ম (Animal Farm)-জর্জ অরওয়েল

১. ম্যানর ফার্মের বিদ্রোহ

ম্যানর ফার্মে মানুষ-মালিক মি. জোনস পশুদের দিয়ে কঠোর পরিশ্রম করায় কিন্তু ন্যায্য খাবার দেয় না। এক রাতে বৃদ্ধ শূকর ওল্ড মেজর পশুদের ডেকে স্বপ্নের কথা বলে—মানুষই তাদের সব দুঃখের কারণ। সে “সব পশু সমান” এই আদর্শে এক সমাজের কল্পনা তুলে ধরে। কিছুদিন পর ওল্ড মেজর মারা যায়, কিন্তু তার ভাবনা পশুদের মধ্যে বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
অবশেষে পশুরা একজোট হয়ে জোনসকে তাড়িয়ে দেয়। খামারের নাম বদলে হয় অ্যানিম্যাল ফার্ম


২. অ্যানিম্যালিজম ও সাত আদেশ

শূকর নেপোলিয়ন, স্নোবল, ও স্কুইলার নেতৃত্বে নতুন মতবাদ অ্যানিম্যালিজম চালু হয়। খামারের দেয়ালে লেখা হয় সাত আদেশ, যার মূল কথা—মানুষের মতো আচরণ নিষিদ্ধ এবং “সব পশু সমান”। শুরুতে সবাই সমানভাবে কাজ করে, ফসল বাড়ে, আশার আলো জ্বলে।


৩. ক্ষমতার দ্বন্দ্ব: নেপোলিয়ন বনাম স্নোবল

স্নোবল উন্নয়নের জন্য উইন্ডমিল তৈরির পরিকল্পনা দেয়। নেপোলিয়ন ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে কুকুরছানাদের গোপনে প্রশিক্ষণ দেয়। এক সভায় কুকুর দিয়ে স্নোবলকে তাড়িয়ে দেয় নেপোলিয়ন। এরপর নেপোলিয়ন একচ্ছত্র শাসক হয়ে ওঠে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আর সাধারণ পশুদের থাকে না।


৪. প্রচারণা ও ইতিহাস বিকৃতি

স্কুইলার ভাষার কৌশলে পশুদের বোঝায় যে নেপোলিয়নের সিদ্ধান্তই সেরা। আগের সিদ্ধান্তগুলোকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়; দেয়ালের আদেশগুলো ধীরে ধীরে বদলে যায়। পশুরা স্মৃতি হারায়, প্রশ্ন করা কমে যায়। কষ্ট বাড়লেও বলা হয়—সবই নাকি “শত্রুর ষড়যন্ত্র”।


৫. শোষণ, ভয় ও স্বীকারোক্তি

খামারে ভয় ঢুকে পড়ে। মিথ্যা অভিযোগে অনেক পশুকে “বিশ্বাসঘাতক” বলে স্বীকারোক্তি করানো হয়, তারপর শাস্তি। কাজ বাড়ে, খাবার কমে। নেপোলিয়ন মানুষের সঙ্গে ব্যবসা শুরু করে—যা একসময় নিষিদ্ধ ছিল। আদর্শ থেকে বিচ্যুতি স্পষ্ট হয়।


৬. উইন্ডমিল ও চূড়ান্ত প্রতারণা

উইন্ডমিল ধ্বংস হয়, আবার বানানো হয়—সব কৃতিত্ব নেপোলিয়নের বলে চালানো হয়। শেষদিকে দেয়ালে একটি আদেশই টিকে থাকে, যা বদলে যায়:
“সব পশু সমান, কিন্তু কিছু পশু অন্যদের চেয়ে বেশি সমান।”


৭. পরিণতি

শেষ দৃশ্যে পশুরা দেখে—শূকররা মানুষের মতো হাঁটে, পোশাক পরে, মানুষের সঙ্গে মদ্যপান করে। বাইরে থেকে তাকালে মানুষ আর শূকরের মধ্যে পার্থক্য করা যায় না। যে শোষণ থেকে মুক্তির জন্য বিদ্রোহ, সেই শোষণই নতুন রূপে ফিরে আসে।


মূল ভাব ও বার্তা

  • ক্ষমতা দুর্নীতিগ্রস্ত করে—বিশেষ করে যখন জবাবদিহি নেই।
  • প্রচারণা ও ভাষা সত্যকে আড়াল করতে পারে।
  • ইতিহাস বিকৃতি শাসন টিকিয়ে রাখার অস্ত্র।
  • আদর্শ হারালে বিপ্লবও স্বৈরশাসনে পরিণত হতে পারে।

অ্যানিম্যাল ফার্ম ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি: একটি সাদৃশ্যপূর্ণ পাঠ

Animal Farm–এ দেখা যায়, শোষণের বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহের মাধ্যমে পুরনো শাসন উৎখাত হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই ক্ষমতা কুক্ষিগত হয় একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর হাতে। আদর্শের নামে শুরু হওয়া সংগ্রাম ক্রমে রূপ নেয় ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনে—যেখানে ভাষা ও প্রচারণা ব্যবহার করে ইতিহাস পাল্টে দেওয়া হয়, ভিন্নমতকে “শত্রু” বানানো হয়, আর সাধারণ মানুষের স্মৃতি ও আশা দুর্বল করে রাখা হয়। এই চিত্রটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গেও গভীরভাবে মিলে যায়। এখানে বহুবার গণআন্দোলন ও পরিবর্তনের ডাক উঠেছে; কিন্তু ক্ষমতায় পৌঁছানোর পর শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্রযন্ত্র, আইন, গণমাধ্যম ও প্রশাসনকে দলীয়করণ করে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করেছে। Animal Farm–এর স্কুইলারের মতোই বাস্তবে প্রচারণা ও শব্দচালনার মাধ্যমে ব্যর্থতা ঢেকে সাফল্যের গল্প বলা হয়; ন্যায়বিচার ও সমতার প্রতিশ্রুতি ধীরে ধীরে রূপ নেয় নির্বাচনী কারসাজি, দমননীতি ও ভয়ের সংস্কৃতিতে। ফলত, বিদ্রোহের লক্ষ্য—জনগণের মুক্তি—অক্ষুণ্ণ থাকে না; বরং শাসক বদলালেও শাসনের চরিত্র একই থেকে যায়। এই কারণেই Animal Farm বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বোঝার এক তীক্ষ্ণ রূপক হিসেবে আজও প্রাসঙ্গিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *