রাষ্ট্র বদলেছে, কিন্তু লাঠিকার হাতে?

২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বড় বাঁক—এমন কথা আজ সর্বত্র শোনা যায়। কিন্তু ক্ষমতার মানচিত্রে নতুন রং লাগালেই কি রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে যায়? বাস্তবতা বলছে, না। কারণ রাষ্ট্রের যন্ত্রগুলো—বিশেষ করে যেটি সবচেয়ে দৃশ্যমান ও ভয়ংকর—সেটি এখনো আগের মতোই আছে। বাংলাদেশ পুলিশ।

ক্ষমতার আসন বদলালেও পুলিশের আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি ও আনুগত্য বদলায়নি। তারা এখনো জনগণের নিরাপত্তার প্রতীক হয়ে ওঠেনি; বরং আগের মতোই রাজনৈতিক বলয়ের প্রয়োজন অনুযায়ী “ব্যবহারযোগ্য” একটি বাহিনী হিসেবেই সক্রিয়। এখানেই প্রশ্নটি সামনে আসে—এত বড় একটি গণঅভ্যুত্থানের পরও পুলিশ কেন অপরিবর্তিত?

বয়ান দিয়ে বিদ্রোহকে অপরাধ বানানো

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই চোখে পড়ে একটি সুপরিকল্পিত বয়ান। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানকে জনগণের ন্যায্য রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং ‘অরাজকতা’, ‘চাঁদাবাজি’ কিংবা ‘অপরাধী নেটওয়ার্ক’-এর তৎপরতা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার ছবি দেখিয়ে কোটি মানুষের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে সামগ্রিকভাবে অপরাধের খাতায় ফেলাই এই বয়ানের লক্ষ্য।

কোনো বড় রাজনৈতিক আন্দোলন কখনোই নিখুঁত হয় না—ইতিহাস তার সাক্ষী। তবু জুলাই আন্দোলনের ক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রমী শাস্তির সংস্কৃতি দেখা যাচ্ছে। এখানে আন্দোলনে যুক্ত হওয়াটাই যেন অপরাধ। দাবি তোলাও দোষ, প্রতিবাদ করাও দোষ। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে চরিত্রহনন যেন একটি নিয়মিত রাজনৈতিক অস্ত্র।

ভাইরাল মিথ্যা ও নৈতিক অবক্ষয়

এই বয়ান ছড়াতে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হয়েছে যাচাইহীন “ভাইরাল তথ্য”। নামহীন সূত্র, অস্পষ্ট অভিযোগ, ফটোকার্ড আর সামাজিক মাধ্যমের ট্রল—এই চারটি উপাদান মিলেই মিথ্যাকে সত্যে রূপ দেওয়া হচ্ছে। একবার কোনো গল্প ভাইরাল হলে সেটির সত্যতা যাচাইয়ের দায় কেউ নেয় না।

গাজীপুরের কিশোরী সুরভীর ঘটনাই তার স্পষ্ট উদাহরণ। কখনো বলা হলো সে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে, কখনো বলা হলো চাঁদাবাজি করেছে, আবার কখনো দাবি করা হলো—সে শুধু “দাবি তুলেছিল”। শেষ পর্যন্ত এজাহারে দেখা গেল, অভিযোগের অঙ্ক কয়েক দশ হাজার টাকার বেশি নয়। কিন্তু ততক্ষণে সামাজিক মাধ্যমে তার চরিত্র সম্পূর্ণ ধ্বংস। আরও গুরুতর অভিযোগ—যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহারের ইঙ্গিত ছিল—সেগুলো মূলধারার সংবাদে জায়গাই পায়নি। মিথ্যাই এখানে বিচারক হয়ে উঠেছে।

প্রশাসন ও পুলিশের পুরোনো খেলা

জুলাইয়ের পরপরই প্রশাসনের আচরণে একধরনের দ্বিধা দেখা গিয়েছিল। ছাত্রনেতৃত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছিল, দরজা খোলা ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক বাতাস বদলাতেই দৃশ্যপট পাল্টে যায়। প্রবেশাধিকার বন্ধ হয়, সংলাপ থামে, আর পুলিশ আবার আগের পরিচিত ভূমিকায় ফিরে যায়—রাজনৈতিকভাবে “ম্যানেজেবল” বাহিনী হিসেবে।

বরিশালের ঝালকাঠি অঞ্চলের ইরফাত শাওনের ঘটনা এই বাস্তবতার একটি নির্মম দলিল। এফআইআরে নাম না থাকা সত্ত্বেও পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো, জামিনের পরও আটক রাখা, একের পর এক পেন্ডিং মামলায় জড়িয়ে রাখা—এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি পরিচিত কৌশল, যা একসময় একটি দলকে ফ্যাসিবাদের পথে নিয়ে গিয়েছিল। আজ সেই কৌশলই আবার সক্রিয়।

এই বাস্তবতা নিয়ে প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানিয়ে একজন সিনিয়র সাংবাদিক মন্তব্য করেছিলেন—পুলিশ এখনো পুরোনো দমনমূলক কাঠামোর মধ্যেই কাজ করছে। অভিযোগের ধরন বদলায়নি, শুধু শাসকের নাম বদলেছে।

কেন বদলায় না পুলিশ?

কারণটি খুবই সরল, কিন্তু ভয়ংকর। বাংলাদেশ পুলিশ কখনোই প্রকৃত অর্থে জনগণের বাহিনী হিসেবে গড়ে ওঠেনি। ১৮৬১ সালের ঔপনিবেশিক পুলিশ আইন আজও কার্যকর। এই আইন তৈরি হয়েছিল প্রজাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য, নাগরিককে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য নয়। ব্রিটিশ শাসকের জায়গায় আজ স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভু এসেছে—কিন্তু কাঠামো রয়ে গেছে একই।

পুলিশ কর্মকর্তাদেরই অনেকের স্বীকারোক্তি—তারা আইনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন রাজনৈতিক নির্দেশকে। এই মানসিকতাই রাষ্ট্রের নৈতিক ভাঙনের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। যেখানে আনুগত্য দক্ষতার চেয়ে বড়, সেখানে ন্যায়বিচার কেবল নথির পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে।

সংস্কার ছাড়া আস্থা ফিরবে না

স্বাধীন পুলিশ কমিশন, নিরপেক্ষ তদন্ত, মানবাধিকারভিত্তিক প্রশিক্ষণ—এই কথাগুলো বাংলাদেশে নতুন নয়। কিন্তু সংস্কার যদি জবাবদিহিহীন হয়, সেটি আরেকটি বিপর্যয় ডেকে আনে। আবার যদি জবাবদিহি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে থাকে, তবে তা নিছক অভিনয়।

বিশ্বের বহু দেশে—নাইজেরিয়া, কেনিয়া, পাকিস্তান—পুলিশ সংস্কারের মূল দাবি ছিল একটি বিষয়েই কেন্দ্রীভূত: স্বাধীন তদারকি ও জনস্বার্থভিত্তিক জবাবদিহি।

বাংলাদেশ পুলিশের বর্তমান অবস্থা কেবল একটি বাহিনীর সংকট নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি। জুলাইয়ের আগুনে শুধু থানার দেয়াল নয়, পুড়ে গেছে মানুষের শেষ আস্থাটুকুও। সেই আস্থা ফেরাতে হলে পুলিশকে দলের অধীনে নয়, আইনের অধীনে আনতেই হবে।

দার্শনিক Michel Foucault একবার বলেছিলেন—ক্ষমতা যেখানে থাকে, প্রতিরোধও সেখানেই জন্ম নেয়; কিন্তু যখন আইনরক্ষকরাই ক্ষমতার হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন প্রতিরোধ নিজেই অপরাধ হয়ে দাঁড়ায়। আজকের বাংলাদেশে এই কথার সত্যতা অস্বীকার করার উপায় নেই।

পুলিশ যদি সত্যিই বদলাতে চায়, তবে তাকে ক্ষমতার লাঠি নয়—ন্যায়ের প্রতীক হয়ে উঠতে হবে। রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সেই পরীক্ষার ফলের দিকেই তাকিয়ে আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *