স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের দেশ, কিন্তু টেকসই পরিবর্তন কেন অধরা?

বাংলাদেশ এমন এক দেশ, যেখানে জনগণের রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা বরাবরই প্রবল। ভাষার প্রশ্নে, স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে, অন্যায়ের প্রতিবাদে—এ দেশের মানুষ বারবার রাস্তায় নেমেছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই ভূখণ্ডে স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলনের অভাব কখনো ছিল না। তবু প্রশ্ন থেকে যায়—এত আন্দোলন, এত আত্মত্যাগ সত্ত্বেও কেন রাষ্ট্র ও ক্ষমতার কাঠামো প্রায় অপরিবর্তিত থেকে যায়?

প্রায় প্রতিটি বড় গণআন্দোলনের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। আন্দোলনের সূচনায় থাকে বিপুল নৈতিক শক্তি, ব্যাপক জনসমর্থন এবং পরিবর্তনের আশা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই শক্তি হয় এলিটদের দ্বারা আত্মসাৎ হয়, নয়তো প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে গিয়েই নিস্তেজ হয়ে পড়ে। ফলাফল হিসেবে আমরা পাই ক্ষমতার আংশিক রদবদল, কিন্তু শাসনব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার নয়।

এর একটি বড় কারণ হলো—বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনগুলো মূলত প্রতিক্রিয়াশীল হলেও পরিকল্পিত নয়। মানুষ জানে সে কষ্ট পাচ্ছে, জানে কোন ঘটনার বিরুদ্ধে সে ক্ষুব্ধ; কিন্তু কেন এই কষ্ট বারবার ফিরে আসে, কোন কাঠামো তা উৎপাদন করে, এবং কীভাবে সেই কাঠামো বদলাতে হয়—এই প্রশ্নগুলোকে সংগঠিতভাবে সামনে আনা হয় না। ফলে আন্দোলন দাবি-কেন্দ্রিক থাকে, ক্ষমতা-কেন্দ্রিক নয়।

আরেকটি দুর্বলতা হলো ধারাবাহিক রাজনৈতিক সংগঠনের অভাব। অধিকাংশ আন্দোলন নির্দিষ্ট ইস্যুতে সীমাবদ্ধ থাকে—একটি আইন, একটি নির্বাচন, একটি ঘটনার বিচার। কিন্তু আন্দোলন শেষ হলে যে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক শূন্যতা তৈরি হয়, তা পূরণ করার মতো প্রস্তুত কাঠামো খুব কম ক্ষেত্রেই থাকে। সেই শূন্যস্থান দখল করে নেয় পুরোনো শক্তিগুলো, যারা রাষ্ট্রযন্ত্র, প্রশাসন ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে আগে থেকেই যুক্ত।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় তাই প্রশ্নটি আর “মানুষ জাগবে কি না”—এই নয়। মানুষ জাগে, বারবার জাগে। আসল প্রশ্ন হলো—এই জাগরণকে কে, কীভাবে এবং কোন লক্ষ্যে সংগঠিত করবে? আন্দোলন যদি কেবল আবেগের বিস্ফোরণ হয়, তবে তা ইতিহাসের পাতায় স্থান পায় ঠিকই, কিন্তু রাষ্ট্রের চরিত্র বদলায় না।

টেকসই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক শিক্ষা, সুসংহত সংগঠন এবং আদর্শগত স্পষ্টতা। প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব ও কাঠামো, যারা আন্দোলনের সময় শুধু স্লোগান দেবে না, বরং আন্দোলনের পর রাষ্ট্র, আইন, প্রশাসন ও ক্ষমতার প্রশ্নে স্পষ্ট রূপরেখা হাজির করবে। নইলে বাংলাদেশ বারবার একই চক্রে ঘুরতে থাকবে—আন্দোলন, আশা, হতাশা, এবং পুনরাবৃত্তি।

ইতিহাস বারবার সুযোগ দেয়, কিন্তু কাঠামোগত প্রস্তুতি না থাকলে সেই সুযোগ হারিয়ে যায়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তাই নির্ভর করছে আরেকটি স্বতঃস্ফূর্ত বিস্ফোরণের ওপর নয়, বরং সেই বিস্ফোরণকে কীভাবে টেকসই রাজনৈতিক রূপ দেওয়া যায়—তার ওপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *