এক বাক্যে ভলতেয়ার: যুক্তি, সহনশীলতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা—এই তিনটিই নিষ্ঠুরতা ও অজ্ঞতার বিরুদ্ধে মানুষের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রতিরক্ষা।
ভলতেয়ার কান্ত বা হেগেলের মতো কোনো কঠোর দর্শনব্যবস্থা নির্মাণকারী ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন লড়াকু চিন্তক—একজন জনবুদ্ধিজীবী, যাঁর দর্শন গড়ে উঠেছিল গোঁড়ামি, স্বৈরশাসন ও বুদ্ধিবৃত্তিক অজ্ঞতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। তাঁর দর্শন মূলত কোনো তাত্ত্বিক কাঠামো নয়; বরং জীবন, ক্ষমতা ও সত্যের প্রতি একটি অবস্থান।
নিচে ভলতেয়ারের দর্শনের মূল ভিত্তিগুলো তুলে ধরা হলো।
১. ডগমার ওপরে যুক্তি
ভলতেয়ার বিশ্বাস করতেন, মানব যুক্তিই পৃথিবীকে বোঝা এবং সমাজ গঠনের সর্বোত্তম হাতিয়ার।
- সত্য যাচাই হবে প্রমাণ ও যুক্তির মাধ্যমে, কর্তৃত্বের মাধ্যমে নয়
- কোনো ধারণা পুরোনো হলেই তা সত্য—এই ধারণা তিনি মানতেন না
- যাজক, রাজা, দার্শনিক—সবাই ভুল করতে পারে
👉 ভলতেয়ারের কাছে আসল শত্রু ছিল অন্ধ নিশ্চিততা।
২. ধর্মীয় সহনশীলতা (নাস্তিকতা নয়)
ভলতেয়ার নাস্তিক ছিলেন না।
- তিনি সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের সম্ভাবনা মানতেন
- কিন্তু সংগঠিত ধর্মের একচেটিয়া সত্যদাবি প্রত্যাখ্যান করতেন
- ধর্মীয় সহিংসতা, নিপীড়ন ও জোর করে বিশ্বাস চাপিয়ে দেওয়ার বিরোধিতা করতেন
ভলতেয়ারের বিখ্যাত বক্তব্যের সারার্থ (হুবহু উদ্ধৃতি নয়):
আমি তোমার কথার সাথে একমত নাও হতে পারি, কিন্তু তোমার তা বলার অধিকার আমি শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব।
ভলতেয়ারের মতে, ধর্ম মানুষের সান্ত্বনা হওয়া উচিত—নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার নয়।
৩. চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
এটি ছিল তাঁর দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু।
- মুক্ত মতপ্রকাশ ছাড়া কোনো সমাজ ন্যায়সঙ্গত হতে পারে না
- বাক্স্বাধীনতা দমন করলে শান্তি আসে না—অজ্ঞতা বাড়ে
- ধর্মদ্রোহ আইন, সেন্সরশিপ ও মতপ্রকাশের শাস্তি সত্যের পথ রুদ্ধ করে
ভলতেয়ারের মতে, মুক্ত বিতর্কই অগ্রগতির ইঞ্জিন।
৪. স্বৈরশাসন ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতার বিরোধিতা
ভলতেয়ার ঘৃণা করতেন ইচ্ছামতো প্রয়োগ করা ক্ষমতা—সে ক্ষমতা আসুক যেখান থেকেই হোক:
- রাজা
- ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান
- উন্মত্ত জনতা
- আদর্শবাদী মতাদর্শ
তিনি বিশ্বাস করতেন, ক্ষমতাকে অবশ্যই আইন, যুক্তি ও জনসমালোচনার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে হবে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, তিনি গণতন্ত্রের চেয়ে **“আলোকিত শাসনব্যবস্থা”**কে কখনো কখনো সমর্থন করেছিলেন—কারণ তিনি মনে করতেন অশিক্ষিত জনতাও সহজেই বিভ্রান্ত হতে পারে। এটি ছিল নৈতিক নয়, বরং বাস্তববাদী অবস্থান।
৫. মতাদর্শের ওপরে ন্যায়বিচার
ভলতেয়ার গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন ভুল বিচার ও অন্যায় শাস্তি নিয়ে।
- অন্যায় মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে তিনি জনসমর্থন গড়ে তুলেছিলেন
- বিচারব্যবস্থার নিষ্ঠুরতা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন
- আইনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানব মর্যাদা রক্ষা, প্রতিশোধ নয়
তাঁর কাছে ন্যায়বিচার ধর্মতত্ত্ব, জাতীয়তাবাদ বা ঐতিহ্যের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।
৬. ব্যঙ্গ—দর্শনের অস্ত্র
ভলতেয়ারের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র ছিল ব্যঙ্গ ও বিদ্রূপ।
Candide–এর মতো রচনায় তিনি আক্রমণ করেছেন:
- অন্ধ আশাবাদ (“সবকিছুই ভালো কারণেই ঘটে”)
- মানবদুঃখ থেকে বিচ্ছিন্ন বিমূর্ত দর্শন
- তত্ত্বের নামে নিষ্ঠুরতা বৈধ করা বুদ্ধিজীবীদের
👉 ভলতেয়ারের কাছে হাস্যরস ছিল মিথ্যা কর্তৃত্ব ভেঙে ফেলার উপায়।
৭. মানবদুঃখ বাস্তব—একে যুক্তি দিয়ে সত্যতা দেওয়া যায় না
ভলতেয়ার বিশ্বাস করতেন না যে দুঃখ কোনো “উচ্চতর কল্যাণের” জন্য প্রয়োজনীয়।
- ভূমিকম্প, যুদ্ধ, রোগ কোনো নৈতিক শিক্ষা নয়
- দুঃখের ব্যাখ্যা দুঃখকে বৈধ করে না
- মানুষের দায়িত্ব হলো দুঃখ কমানো, ব্যাখ্যা দিয়ে তাকে সত্যতা দেওয়া নয়
এই জায়গায় ভলতেয়ার অত্যন্ত আধুনিক।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট:
ভলতেয়ারের দর্শন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে যখন এটি ধর্মীয় সহনশীলতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, এবং ক্ষমতার প্রতি ন্যায্যতা নিয়ে কথা বলে। এখানে তার দর্শনের প্রভাব কিভাবে বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতির সাথে সংযুক্ত হতে পারে, তা বিশ্লেষণ করা হলো:
১. ধর্মীয় সহনশীলতা এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশ একটি ধর্মীয়ভাবে অনুকূল সমাজ, যেখানে ইসলাম ধর্ম প্রধান হলেও অন্য ধর্মেরও যথেষ্ট উপস্থিতি রয়েছে। ভলতেয়ার যেভাবে ধর্মীয় সহনশীলতার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, বাংলাদেশের জন্যও তা গুরুত্বপূর্ণ। তার দর্শন অনুযায়ী, ধর্মীয় সহিংসতা বা ধর্মীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া আমাদের সমাজকে আরও সহনশীল এবং বর্ণবৈচিত্র্যপূর্ণ করে তুলবে।
বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদ ও মৌলবাদ দমন করতে ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সহনশীলতার অধিকার নিশ্চিতে ভলতেয়ারের দর্শন কার্যকর হতে পারে। এটি মুসলিম ও সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলির মধ্যে সহাবস্থানের সম্ভাবনা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
২. মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
ভলতেয়ার মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি তার অটুট সমর্থন দেখিয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে, যেখানে সরকারী বাহিনীর নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি একক আধিপত্য এবং মতপ্রকাশের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকে, ভলতেয়ারের দর্শনটি একটি বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণগুলির উপর স্বাধীনতা বৃদ্ধির জন্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে সরকারের নীতি বা আইনগুলোর প্রতি সমালোচনার অধিকার থাকা এবং এটি জনসমক্ষে প্রকাশ করতে পারা, একে অপরকে সমালোচনা করার মাধ্যমে সমাজের দ্বন্দ্ব এবং শোষণ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
৩. স্বৈরশাসন এবং নিরঙ্কুশ ক্ষমতার বিরোধিতা
ভলতেয়ারের দর্শন অনুযায়ী, স্বৈরশাসন এবং নিরঙ্কুশ ক্ষমতা মানুষের স্বাধীনতার পথে বড় বাধা। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, যেখানে রাজনৈতিক বিরোধীদের উপর দমন-পীড়ন এবং বিচারব্যবস্থায় পক্ষপাতিত্ব প্রায়শই দেখা যায়, ভলতেয়ারের দর্শন এ সমস্যা মোকাবেলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশে আইনের শাসন এবং নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করতে, ভলতেয়ারের দর্শন একটি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারে। তাঁর দর্শন অনুযায়ী, কোনো শাসন ব্যবস্থা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, সে ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতে জনতাকে সচেতন ও সক্ষম করে তোলা উচিত।
৪. প্রকৃত ন্যায়বিচারের প্রতি আগ্রহ
ভলতেয়ার সবসময়ই ন্যায়বিচারের পক্ষপটে ছিলেন এবং মানবাধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের সমাজে ন্যায়বিচারের প্রসারিত প্রয়োজন, যেখানে জনগণের অধিকারের প্রতি সঠিক মনোভাব নেওয়া হয়। ভলতেয়ারের মতাদর্শ অনুসরণ করলে, অন্যায় শাস্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং বিচারের পক্ষে দাঁড়ানো আরও শক্তিশালী হতে পারে।
এই দর্শন অনুযায়ী, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সঠিক বিচার প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করা হলে, বাংলাদেশে ন্যায়বিচারের পরিবেশ উন্নত হতে পারে এবং জনগণ আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী হতে পারে তাদের অধিকার নিয়ে।
৫. ব্যঙ্গ এবং সমালোচনা
ভলতেয়ার ব্যঙ্গের মাধ্যমে সমাজের অদৃশ্য ও অস্বাভাবিক বিষয়গুলির প্রতি আলোকপাত করেছেন। বাংলাদেশে, যেখানে একদলীয় রাজনৈতিক পরিবেশ অনেক সময় মুক্ত চিন্তাকে অবমাননা করে, ব্যঙ্গ ও সমালোচনার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির প্রয়োজন।
তার দর্শন সমাজে বিদ্যমান অথর্বতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে।
সারাংশ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে ভলতেয়ারের দর্শন ধর্মীয় সহনশীলতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, এবং ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানো সহ স্বৈরশাসনের বিরোধিতা করতে সাহায্য করতে পারে। তার দর্শন আমাদের চিন্তায় পরিবর্তন এনে, একটি উদার, শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে সহায়ক হতে পারে।