প্রতিবছর বর্ষা আসে, আবার চলে যায়। বর্ষার সময় আমরা জলাবদ্ধতা, বন্যা ও ভোগান্তিতে অতিষ্ঠ হই। অথচ মাত্র কয়েক মাস পরই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শুরু হয় পানির সংকট। কৃষক সেচের জন্য হাহাকার করেন, শহরে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যায়, উপকূলে মানুষ নিরাপদ পানির জন্য কিলোমিটারের পর কিলোমিটার হাঁটে। প্রশ্ন হলো—পৃথিবীর অন্যতম বৃষ্টিবহুল দেশে থেকেও আমরা কেন পানির অভাবে ভুগি?
এর উত্তর প্রকৃতির কাছে নয়, আমাদের পরিকল্পনার কাছে।
বাংলাদেশে বছরে গড়ে দুই হাজার মিলিমিটারেরও বেশি বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ পানির অধিকাংশই অল্প সময়ের মধ্যে নদী হয়ে সাগরে চলে যায়। বর্ষায় আমরা পানি সরানোর জন্য ব্যস্ত থাকি, আর শুষ্ক মৌসুমে সেই পানিই আবার খুঁজে বেড়াই। এটি শুধু পরিকল্পনার ব্যর্থতা নয়, জাতীয় সম্পদের অপচয়।
পানি ব্যবস্থাপনাকে আমরা এখনো মূলত নিষ্কাশনের সমস্যা হিসেবে দেখি। তাই বর্ষা এলেই ড্রেন পরিষ্কার, নালা খনন, বড় ড্রেন নির্মাণ—এসব নিয়েই ব্যস্ততা শুরু হয়। কিন্তু শুধু ড্রেন বড় করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। পানির গন্তব্যও থাকতে হবে। যে পানি দ্রুত শহর থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে, সেই পানি কোথায় সংরক্ষণ করা হবে—এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের পরিকল্পনায় খুব কমই দেখা যায়।
বিশ্বের বহু দেশ অনেক আগেই এই শিক্ষা গ্রহণ করেছে। নেদারল্যান্ডসের নীতি হলো—পানিকে থামানো নয়, তাকে জায়গা দেওয়া। তারা নদীর পাশে জলাধার ও বন্যা ধারণ এলাকা তৈরি করেছে। জাপানের টোকিও শহরের নিচে বিশাল ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে, যা অতিবৃষ্টির পানি সাময়িকভাবে ধারণ করে শহরকে জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা করে। আমাদের হয়তো এত বড় বিনিয়োগের সামর্থ্য নেই, কিন্তু খাল পুনরুদ্ধার, জলাধার সৃষ্টি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক জলাভূমি রক্ষার মতো অনেক কার্যকর পদক্ষেপ তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়ে নেওয়া সম্ভব।
বিশেষ করে উপকূলীয় বাংলাদেশে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ জীবন বদলে দিতে পারে। সেখানে চারদিকে পানি থাকলেও নিরাপদ পানির তীব্র সংকট। সমুদ্র, নদী ও ভূগর্ভস্থ পানির লবণাক্ততা লাখো মানুষকে অনিরাপদ পানি ব্যবহার করতে বাধ্য করছে। অথচ প্রতিটি পরিবার বা গ্রামভিত্তিক বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে পুরো শুষ্ক মৌসুমের পানির চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করা সম্ভব।
কৃষিক্ষেত্রেও একই চিত্র। আমরা সেচের জন্য ক্রমাগত ভূগর্ভস্থ পানি তুলছি, অথচ বৃষ্টির পানি মাটিতে ধরে রাখার জন্য খুব সামান্য উদ্যোগ নিচ্ছি। এর সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত—মাটির স্বাস্থ্য। বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষিজমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ আদর্শ মাত্রার অনেক নিচে। ফলে মাটি পানি ধরে রাখতে পারে না। বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে যায়, আবার খরার সময় জমি দ্রুত শুকিয়ে যায়।
এই সমস্যার একটি সহজ সমাধান রয়েছে—কম্পোস্টের ব্যবহার বাড়ানো। শহরের বিপুল পরিমাণ রান্নাঘরের জৈব বর্জ্য কম্পোস্টে রূপান্তর করা গেলে একদিকে যেমন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চাপ কমবে, অন্যদিকে কৃষিজমির পানি ধারণক্ষমতা ও উর্বরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। পানি সংরক্ষণ এবং মাটির স্বাস্থ্য—দুই সমস্যারই একসঙ্গে সমাধান সম্ভব।
আমাদের নগর পরিকল্পনায়ও মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রতিটি নতুন আবাসিক প্রকল্প, শিল্প এলাকা, সরকারি ভবন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা থাকা উচিত। বড় বড় ভবনের ছাদ থেকে বছরে লাখ লাখ লিটার পানি সরাসরি ড্রেনে চলে যায়। এই পানি সংরক্ষণ করা গেলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
একই সঙ্গে দেশের খাল, বিল, জলাভূমি ও প্রাকৃতিক পানি ধারণ এলাকা সংরক্ষণকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। গত কয়েক দশকে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দখলের কারণে অসংখ্য খাল ও জলাভূমি হারিয়ে গেছে। এর ফলেই আজ সামান্য বৃষ্টিতেই শহর জলমগ্ন হয়ে পড়ে।
সমাধানের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প সব সময় প্রয়োজন হয় না। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর স্থানীয় উদ্যোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকার। প্রতিটি উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের জন্য একটি সমন্বিত বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়ন করা উচিত, যেখানে পানি সংরক্ষণ, খাল পুনরুদ্ধার, জলাধার নির্মাণ, বৃষ্টির পানি সংগ্রহ এবং জলাভূমি সংরক্ষণকে একসঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
বাংলাদেশের সামনে পানি সংকটের সমাধান আকাশ থেকেই প্রতিবছর নেমে আসে। কিন্তু আমরা সেই সম্পদকে ধরে রাখতে না পেরে একে দুর্যোগে পরিণত করি। বৃষ্টিকে অভিশাপ নয়, সম্পদ হিসেবে দেখতে শিখতে হবে। কারণ আগামী দিনের বাংলাদেশে পানিই হবে সবচেয়ে মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদগুলোর একটি।
প্রকৃতি প্রতিবছর আমাদের সুযোগ দেয়। এখন সিদ্ধান্ত আমাদের—আমরা কি শুধু বৃষ্টিতে ভিজব, নাকি সেই পানিকে ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করব?