ভুল কৃষি তথ্যের মূল্য দেয় কৃষক, ভোক্তা ও রাষ্ট্র

বাংলাদেশে প্রায়ই একটি প্রশ্ন ওঠে—সরকার যখন রেকর্ড পরিমাণ ধান উৎপাদনের কথা বলে, তখন বাজারে চালের দাম এত বেশি কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই বুঝতে হবে যে মোট উৎপাদন, প্রকৃত প্রাপ্যতা, বাজারে সরবরাহ, মজুত এবং ভোগ এক বিষয় নয়।

ধানের উৎপাদন বেশি হলেই তার সমপরিমাণ চাল বাজারে আসবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। মোট উৎপাদনের একটি অংশ কৃষকের পারিবারিক ভোগে ব্যবহৃত হয়, কিছু অংশ বীজ হিসেবে সংরক্ষিত থাকে, কিছু অংশ ফসল কাটার পর নষ্ট হয় এবং কিছু অংশ কৃষক, মিলার ও ব্যবসায়ীদের কাছে মজুত থাকে। অন্যদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, শিল্প খাতে ব্যবহার এবং দুর্যোগজনিত অতিরিক্ত চাহিদার কারণে মোট ভোগও প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। ফলে কাগজে উৎপাদন বাড়লেও সরবরাহ, মজুত ও ভোগের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে বাজারে ঘাটতি, মূল্যবৃদ্ধি ও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

বাংলাদেশের ১৭ কোটির বেশি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির একটি বড় অংশ কৃষি উৎপাদনসংক্রান্ত সঠিক তথ্যের ওপর নির্ভরশীল। কৃষিনীতি প্রণয়ন, খাদ্য আমদানি ও রপ্তানি, বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখা, কৃষককে প্রণোদনা দেওয়া, সরকারি খাদ্য মজুত নির্ধারণ এবং সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তা পরিকল্পনা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নির্ভরযোগ্য উপাত্ত অপরিহার্য।

কিন্তু দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দেওয়া কৃষি উৎপাদনের হিসাবে প্রায়ই উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়। কখনো উৎপাদন বাস্তবের চেয়ে বেশি দেখানো হয়, কখনো কম; আবার সরকারি হিসাবের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতারও মিল পাওয়া যায় না। এ ধরনের অসংগতি শুধু পরিসংখ্যানগত দুর্বলতা নয়; এর প্রভাব পড়ে সরকারি নীতি, খাদ্যবাজার, জাতীয় অর্থনীতি এবং কৃষক ও ভোক্তার জীবনের ওপর।

বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদনসংক্রান্ত তথ্য প্রধানত সরকারি জরিপ, মাঠপর্যায়ের অনুমান, প্রশাসনিক প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব হিসাব থেকে সংগ্রহ করা হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই), খাদ্য অধিদপ্তর, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর এবং বিভিন্ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এসব তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলোর নমুনা নির্বাচন, তথ্য সংগ্রহের সময়কাল, ফলন নির্ধারণের পদ্ধতি এবং বিশ্লেষণপ্রক্রিয়া এক নয়। ফলে একই ফসলের উৎপাদন নিয়েও একাধিক হিসাব পাওয়া যায় এবং নীতিনির্ধারণের জন্য কোন তথ্যটি সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য—সে প্রশ্ন সামনে আসে।

২০২০ সালের বোরো উৎপাদনের হিসাব এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে সে বছর প্রায় দুই কোটি টন বোরো উৎপাদিত হয়েছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো উৎপাদনের পরিমাণ নির্ধারণ করেছিল প্রায় এক কোটি ৯৬ লাখ টন। সংখ্যাগতভাবে এই ব্যবধান খুব বড় মনে না হলেও খাদ্য পরিকল্পনা, সরকারি মজুত এবং আমদানির প্রয়োজন নির্ধারণে কয়েক লাখ টনের পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করে সরকার বিবিএস, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সহযোগিতায় ‘হারমোনাইজড ক্রপ এস্টিমেশন মেথড’ চালুর উদ্যোগ নেয়। এর উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন হিসাবের ব্যবধান কমিয়ে একটি সমন্বিত ও গ্রহণযোগ্য উৎপাদন অনুমানপদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা। এই উদ্যোগের ফলে তথ্য সংগ্রহ, ফলন নির্ধারণ ও উৎপাদন হিসাবের ক্ষেত্রে সমন্বয় বেড়েছে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্যে আগের তুলনায় কিছুটা সামঞ্জস্য এসেছে। এই অভিজ্ঞতা দেখায়, কৃষি পরিসংখ্যানের আপাতদৃষ্টিতে সামান্য ব্যবধানও নীতিনির্ধারণে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে।

কৃষি পরিসংখ্যানের এই গরমিলের পেছনে প্রথমেই আসে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের দুর্বলতা। অনেক ক্ষেত্রে অল্পসংখ্যক জমি বা ‘প্লট’ পর্যবেক্ষণ করে পুরো এলাকার উৎপাদন অনুমান করা হয়। অথচ একই এলাকার মধ্যেও জমির ধরন, মাটির উর্বরতা, সেচব্যবস্থা, ফসলের জাত, রোগবালাই এবং আবহাওয়ার তারতম্যের কারণে ফলনে বড় পার্থক্য হতে পারে। যথাযথভাবে নমুনা নির্বাচন করা না হলে সীমিতসংখ্যক প্লটের তথ্যের ভিত্তিতে পুরো এলাকার উৎপাদন নির্ধারণে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

কৃষকদের কাছ থেকে সংগৃহীত তথ্যও সব সময় পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য হয় না। অনেক কৃষক তাঁদের জমির সঠিক পরিমাণ কিংবা মোট উৎপাদনের হিসাব সংরক্ষণ করেন না। কেউ কর, ঋণ বা সরকারি সুবিধাসংক্রান্ত আশঙ্কায় উৎপাদন কম দেখাতে পারেন। আবার কেউ নিজের সাফল্য তুলে ধরতে উৎপাদন বাড়িয়ে বলতে পারেন। ফলে এসব তথ্যের ভিত্তিতে করা হিসাবেও ত্রুটি থেকে যেতে পারে।

প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপও অনেক সময় কৃষি পরিসংখ্যানকে প্রভাবিত করে। উৎপাদন বৃদ্ধির ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরার প্রবণতা থেকে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বাস্তবের চেয়ে বেশি ফলন দেখাতে উৎসাহিত হতে পারেন। বিপরীতভাবে, দুর্যোগের সময় প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ এড়াতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম দেখানোর প্রবণতাও থাকতে পারে। এ ধরনের চর্চা তাৎক্ষণিকভাবে ইতিবাচক চিত্র তৈরি করলেও দীর্ঘ মেয়াদে নীতিনির্ধারণকে ভুল পথে পরিচালিত করে।

এর পাশাপাশি কৃষিজমির সঠিক ও হালনাগাদ হিসাব না থাকাও একটি গুরুতর সমস্যা। নগরায়ণ, শিল্পায়ন, সড়ক নির্মাণ এবং নদীভাঙনের কারণে প্রতিবছর কৃষিজমির পরিমাণ কমছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো জমির পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করেই বর্তমান উৎপাদনের হিসাব করা হয়। এতে কাগজে-কলমে উৎপাদনের পরিমাণ বাস্তবের চেয়ে বেশি দেখানোর আশঙ্কা থাকে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দ্রুত মূল্যায়ন করতে না পারাও কৃষি তথ্যে গরমিলের অন্যতম কারণ। বন্যা, খরা, শিলাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের কারণে মাঠের অবস্থা অল্প সময়ের মধ্যেই বদলে যেতে পারে। কিন্তু তথ্য সংগ্রহ ও প্রতিবেদন তৈরিতে সময় লাগায় অনেক ক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র সরকারি হিসাবে উঠে আসে না। হাওর ও উপকূলীয় অঞ্চলে এই সমস্যা বিশেষভাবে প্রকট।

তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে আধুনিক প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এখনো অনেক ক্ষেত্রে হাতে লেখা তথ্য এবং অনুমাননির্ভর হিসাবের ওপর নির্ভর করা হয়। এতে মানবিক ভুল, একই তথ্য একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত হওয়া এবং গাণিতিক ত্রুটির ঝুঁকি থেকে যায়।

কৃষি তথ্যব্যবস্থার এই দুর্বলতার পরিণতি কতটা গুরুতর হতে পারে, তার একটি উদাহরণ ২০০৭-০৮ সালের খাদ্যসংকট। ২০০৭ সালে বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় সিডরের কারণে দেশে ধান উৎপাদন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু দুর্যোগের পরপরই ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত তথ্য পাওয়া যায়নি। সম্ভাব্য উৎপাদন ঘাটতি কত, দেশে কী পরিমাণ খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে এবং কতটুকু আমদানি প্রয়োজন—এসব বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়।

একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম দ্রুত বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে উচ্চমূল্যে চাল আমদানি করতে হয় এবং দেশের বাজারেও মূল্য অস্থিরতা বেড়ে যায়। সেই সংকটের একমাত্র কারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না; দুর্যোগ-পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতির দ্রুত ও নির্ভুল মূল্যায়ন করতে না পারায় সময়মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়েছিল এবং সংকটের প্রভাব আরও তীব্র হয়েছিল।

সাম্প্রতিক একটি বোরো মৌসুমেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি হিসাবের মধ্যে বিরাট পার্থক্য দেখা গেছে। সরকারি হিসাবে যেখানে প্রায় দুই লাখ টন উৎপাদন ক্ষতির কথা বলা হয়েছিল, সেখানে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ, কৃষি গবেষক ও গণমাধ্যমভিত্তিক মূল্যায়নে ক্ষতির পরিমাণ ১৪ থেকে ১৫ লাখ টন পর্যন্ত হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়।

এই ব্যবধান নিছক সংখ্যার পার্থক্য নয়। এটি দেশের প্রকৃত খাদ্য পরিস্থিতি, সম্ভাব্য আমদানির প্রয়োজন, সরকারি মজুত ব্যবস্থাপনা এবং বাজারমূল্যের পূর্বাভাসকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে। প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ কম ধরে নেওয়া হলে প্রয়োজনীয় নীতিগত ব্যবস্থা নিতে বিলম্ব হতে পারে। আবার ক্ষতির অতিরঞ্জিত হিসাব অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক সৃষ্টি করে ভুল সিদ্ধান্তের জন্ম দিতে পারে। তাই দুর্যোগপ্রবণ কৃষি অঞ্চলে দ্রুত, নির্ভুল ও প্রযুক্তিনির্ভর ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নব্যবস্থা অপরিহার্য।

কৃষি পরিসংখ্যানের দুর্বলতার আরেকটি দৃষ্টান্ত আলুর বাজারে প্রায়ই দেখা যায়। দেশে একাধিকবার আলুর বাম্পার উৎপাদনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, পর্যাপ্ত হিমাগার সুবিধা নেই, বাজারে চাহিদা কম, রপ্তানি পরিকল্পনা দুর্বল এবং প্রকৃত বাজার চাহিদা সম্পর্কেও নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব রয়েছে। ফলে কৃষক কখনো রাস্তার পাশে আলু ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছেন, আবার কখনো উৎপাদন খরচও তুলতে পারেননি।

এখানে সমস্যা শুধু কত আলু উৎপাদিত হয়েছে, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাজারের অবস্থা, মূল্য, সরবরাহ, চাহিদা, ভোক্তার আচরণ এবং ব্যবসায়িক প্রবণতা সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের দুর্বলতাও এর জন্য দায়ী। উৎপাদনের সঠিক হিসাব থাকলেও বাজারবিষয়ক পর্যাপ্ত তথ্য না থাকলে কৃষককে লোকসান থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয় না।

কৃষি পরিসংখ্যানের গরমিলের প্রভাব তাই বহুমাত্রিক। প্রকৃত উৎপাদন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ধারণা না থাকলে সরকার কখন ও কতটুকু খাদ্য আমদানি করবে অথবা সরকারি গুদামে কত মজুত রাখবে—সে বিষয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে। বিভ্রান্তিকর উৎপাদন তথ্য বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে এবং অসাধু ব্যবসায়ী ও বাজার সিন্ডিকেটকে পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করে।

কৃষকেরাও এর প্রত্যক্ষ শিকার হন। প্রাকৃতিক দুর্যোগে তাঁদের প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবে প্রতিফলিত না হলে তাঁরা প্রয়োজনীয় প্রণোদনা, সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। একইভাবে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত গবেষণা এবং প্রণীত নীতি দীর্ঘ মেয়াদে পুরো কৃষি খাতকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। তাই দেশের খাদ্য পরিস্থিতি মূল্যায়নে শুধু উৎপাদনের হিসাব যথেষ্ট নয়; উৎপাদন, প্রকৃত প্রাপ্যতা, বাজার সরবরাহ, মজুত ও ভোগ—এই পাঁচটি উপাদানকে সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।

এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য কৃষি পরিসংখ্যান সংগ্রহে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। স্যাটেলাইট ইমেজ, ড্রোন, জিআইএস ও রিমোট সেন্সিংয়ের মাধ্যমে কৃষিজমির পরিমাণ, ফসলের অবস্থা এবং সম্ভাব্য ফলন সম্পর্কে অধিক নির্ভুল ধারণা পাওয়া সম্ভব। বিশ্বের অনেক দেশ ফসল উৎপাদন পর্যবেক্ষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডিজিটাল কৃষি তথ্যব্যবস্থা ব্যবহার করছে। বাংলাদেশেও এসব প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারণ করা দরকার।

প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও শক্তিশালী করতে হবে। কৃষি ও ফসল উৎপাদনসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ, যাচাই এবং বিশ্লেষণের দায়িত্বে থাকা পরিসংখ্যান কর্মকর্তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তাঁদের পেশাগত দক্ষতা, স্বাধীনতা ও মর্যাদা বাড়ানোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণপদ্ধতির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

তবে শুধু উৎপাদনের হিসাব নির্ভুল করলেই সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান হবে না। বাংলাদেশের জন্য একটি সমন্বিত ‘অ্যাগ্রিকালচারাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্স সিস্টেম’ গড়ে তোলা জরুরি। এই ব্যবস্থায় উৎপাদন, মজুত, বাজার সরবরাহ, ভোগ, পরিবহন, আমদানি-রপ্তানি, মূল্য পরিস্থিতি, ভোক্তার আচরণ এবং ব্যবসায়িক প্রবণতা—সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ ও সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।

এ ধরনের ব্যবস্থা গড়ে উঠলে সরকার ভবিষ্যতের সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি সম্পর্কে অধিক নির্ভরযোগ্য ধারণা পাবে। ফলে যথাসময়ে খাদ্য আমদানি, সরকারি মজুত গড়ে তোলা এবং বাজারে প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে। কৃষকেরাও সম্ভাব্য চাহিদা ও বাজারমূল্য সম্পর্কে ধারণা নিয়ে তাঁদের উৎপাদন পরিকল্পনা করতে পারবেন।

নির্ভুল কৃষি পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা শুদ্ধ রাখার বিষয় নয়; এর সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তা, বাজারের স্থিতিশীলতা, কৃষকের ন্যায্যমূল্য এবং ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা সরাসরি সম্পর্কিত। তাই একটি আধুনিক, সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা বাংলাদেশের টেকসই কৃষি উন্নয়নের অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত। কারণ ভুল কৃষি তথ্যের মূল্য শেষ পর্যন্ত শুধু সরকার নয়—কৃষক, ভোক্তা এবং পুরো রাষ্ট্রকেই দিতে হয়।